ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদের নাম লিপিবদ্ধ করার দাবী |
| ****** লিখেছেন: নূর আলম, আইএনবি |
এ দেশের শ্রেষ্ঠ একটি কলেজ ময়মনসিংহ, আনন্দ মোহন কলেজ। ময়মনসিংহ শহরের হামিদ উদ্দিন রোড, কলেজ রোড এবং কাচিঝুলী মহল্লার বিস্তৃত এলাকা জুড়ে কলেজটি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয় ১৯০১ সালে। সেসময় ছিলো ব্রিটিশ আর জমিদারদের দ্বৈত শাসন। কঠোর অনুশাসন। কিন্তু, এরপরও শিক্ষা বিস্তারের কোন কমতি ছিলো না। এ অঞ্চলে। আনন্দমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে রাজা জমিদারদের পাশাপাশি দুই ব্যক্তি দুই বন্ধুর ঘামের ফোঁটা আজও আনন্দ মোহন কলেজের অট্টালিকার প্রতিটি ইটের পাঁজরে গ্রথিত হয়ে আছে। এক বন্ধু ব্যারিস্টার আনন্দ মোহন বসু। ওই সময়ের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শিক্ষাবিদ রাজনীতিক সমাজ সংস্কারক। আরেক বন্ধু, ময়মনসিংহ জেলার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট শিক্ষানুরাগী মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহ্মদ। কালের বিবর্তনে ব্যারিস্টার আনন্দ মোহন বসু ইতিহাসের পাতায় উঠে এসেছেন কিন্তু মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ রয়ে গেছেন ইতিহাসের ছাইচাপা আগুনে। দুই বন্ধুই ছিলেন আনন্দ মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম দুই সিপাহশালার। স্মর্তব্য, ময়মনসিংহ শহরের হামিদ উদ্দিন রোড মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর স্বাক্ষ্য বহন করছে আজও। ময়মনসিংহের অন্যতম প্রবক্তা পুরুষ, ধর্ম পরায়ন মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ ছিলেন শিক্ষানুরাগী এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। যতদুর জানা যায়, নিকটতম আত্মীয় এক বৃদ্ধা ছাড়া হামিদ উদ্দিন আহমদ এর নাতনী মোসাম্মৎ ফজিলাতুল নেছা ওরফে লাইলী বেগম কেউ আর বেঁচে নেই। আনন্দ মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য এই ছাই চাপা আগুন ব্যক্তিটি কাচিঝুলীতে ২৬ বিঘা জমি অকাতরে দান করেই নিজ দায়িত্ব থেকে সরে যাননি সেই সাথে তার প্রিয়তম বন্ধু আনন্দ মোহন বসু’র নামে কলেজটির নামকরণের প্রস্তাব করেন এবং ১৯০৮ সালের শেষের দিকে মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমেদের প্রস্তাব মত কলেজটি আনন্দ মোহন বসুর নামানুসারে আনন্দ মোহন কলেজ রাখা হয় এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর মতো একজন প্রজ্ঞা সম্পন্ন উদার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্বের কারণেই আজ এটা সম্ভব হয়েছে। আনন্দ মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠার আড়ালে যে মানুষটি সেই সময়ে ২৬ বিঘা জমি নির্বিঘেœ নিঃশ্চিন্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য দিয়ে দিতে পারেন তিনি তো আমাদের প্রাতঃস্মরণীয়। প্রতি মুহুর্তের অবিস্মরণীয় এক নাম। অথচ, এতকাল পরও আনন্দ মোহন কলেজ এই মহান ব্যক্তিটির জন্যে কী করেছে তা ময়মনসিংহবাসীকে প্রশ্নের উদ্রেক করেছে। আনন্দ মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে যাদের অসামান্য অবদান তাদের মধ্যে অন্যতম পথিকৃৎ মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ একথা অকপটে সবাই বলে গেছেন। আনন্দ মোহন কলেজের ১শ বছরের পূর্তি অনুষ্ঠানের বক্তব্যে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ কলেজটি প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান পুরুষ হিসেবে মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ-এর নাম বিনয় চিত্তে স্মরণ করেছেন। কিংবদন্তীর এই প্রাণ পুরুষ মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর কাছে সবিনয় ঋণ স্বীকার করে ময়মনসিংহবাসীকেও সেখান থেকে উত্তাপ নেয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন আনন্দ মোহন কলেজ তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখা। তার বন্ধু, আনন্দ মোহন বসু আজ যদি দেখতে পেতেন তারই বন্ধু মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর আনীত প্রস্তাবে তার নামটির পাশে তার বন্ধুর নামটি নেই, তাহলে তিনি (আনন্দমোহন বসু) কি কষ্ট পেতেন না? বর্তমান প্রেক্ষাপটে সময় বদলেছে, বদলেছে দিন। কালের আবর্তনে স্বাভাবিক ভাবেই বর্তমান প্রজন্ম ভুলতে বসেছে, তাদের স্বর্ণখচিত অতীতকে যে অতীত, একটি স্বর্নোজ্জল বর্তমান এই প্রজন্মকে উপহার দিয়েছে। যার পেছনের মানুষদের নাম আজ অজানা থেকেছে। কিন্তু ইতিহাস, ইতিহাসের পথেই চলে এবং একদিন না একদিন সেই ইতিহাসই সময়ের মূর্ত প্রতীক হয়ে আমাদের সামনে সসম্মানে এসে দাঁড়িয়ে যাবে। মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর নাম তখন গর্বচিত্তে ময়মনসিংহবাসী স্মরণ করবেন। এদিকে, ময়মনসিংহবাসী মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ এর নাম আনন্দ মোহন কলেজের প্রধান ফটকে প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লিপিবদ্ধ করার জন্য সর্ব মহলের দৃষ্ট আকর্ষণ করেছেন। তবে এ ব্যাপারে প্রথমত: আনন্দ মোহন কলেজ কর্তৃপক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি প্রস্তাবনা আকারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে পারেন। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন কেন এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি, তা নিয়েও অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, আনন্দমোহন কলেজের ছাত্রাবাসের একটি হলের নাম, একটি ল্যাবরেটরীর নাম একটি মিলনায়তনের নাম, এমনকি নিদেনপক্ষে আনন্দমোহন কলেজের বিশাল মাঠের একটি জায়গায় অন্তত একটি মসজিদ মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমেদের স্মরণে নির্মিত হলে হয়তো বা আমরা দায়মুক্ত হতে পারতাম। তথ্যসূত্র: আইএনবি |
Pages
বিষয় সূচী
- ওয়েব ডায়েরী (2)
- কলেজ ইতিহাস (3)
- জব সাইট (1)
- বাংলা (1)
- বিসিএস প্রস্তুতি (4)
- বিসিএস প্রিলিমিনারী (1)
- বিসিএস লিখিত (1)
Abdullah Al Imran এর টেকটিউনস
Showing posts with label কলেজ ইতিহাস. Show all posts
Showing posts with label কলেজ ইতিহাস. Show all posts
Friday, January 27, 2012
একটি আত্মপর্যালোচনা
এক নজরে আনন্দ মোহন কলেজ তথ্যাবলি
প্রতিষ্ঠা বছর | ১৯০৮ |
সরকারিকরণ | ১৯৬৪ |
মোট আয়তন | ১৫.২৮ একর |
ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা | প্রায় ২৮ হাজার |
শিক্ষক পদসংখ্যা | ২০১ টি |
অধ্যাপক | ১৪ জন |
সহযেগী অধ্যাপক | ৪৩ জন |
সহকারী অধ্যাপক | ৬১ জন |
প্রভাষক | ৭০ জন |
প্রদর্শক | ০৮ জন |
শরীরচর্চা শিক্ষক | ০১ জন |
গ্রন্থাগারিক | ০১ জন |
সহগ্রন্থাগারিক | ০১ জন |
ছাত্রাবাস | ০৩টি |
ছাত্রীনিবাস | ০২টি |
বিভাগের সংখ্যা | ১৯টি |
মোট অনুষদ | ০৪টি |
গ্রন্থাগারের মোট পুস্তক সংখ্যা | প্রায় ৪৮,০০০ |
মসজিদ | ০১টি |
অতিথি ভবন | ০১টি |
শিক্ষক ডমেনটরী | ০১টি |
পাওয়ার স্টেশন | ০১টি |
বাস | ০১টি |
মাইক্রোবাস | ০১টি |
স্নাতক সম্মান এবং স্নাতকোত্তর বিভাগ সমূহ
বাংলা | সমাজকর্ম© | পদার্থবিদ্যা |
ইংরেজী | সমাজবিজ্ঞান | রসায়নবিদ্যা |
ইতিহাস | ইসলাসমক স্ট্যাডিজ | উদ্ভিদবিদ্যা |
রাষ্ট্রবিজ্ঞান | ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি | প্রাণিবিদ্যা |
অর্থনীতি | ভূগোল ও পরিবেশ | ব্যবস্থাপনা |
দর্শন | গণিত | হিসাববিজ্ঞান |
সংস্কৃত | ||
তথ্যসূত্র: আনন্দ মোহন কলেজ ওয়েব সাইট
Thursday, January 26, 2012
আনন্দ মোহন কলেজ এর
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
১৯১৪ সালে কলেজটি প্রথম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার পর থেকে কলেজরি খ্যাতি এবং ছাত্রসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কালকমে এটি এতদঞ্চললের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে । ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে কলেজকিে সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার পর কলেজের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ একাডেমিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়। শিক্ষকের পদ সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস ও একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠাকালে যেখানে আনন্দ মোহন কলেজে ছাত্র ছিল ১৭৮ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৯জন, সেখানে বর্তমানে ছাত্র সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০ এবং শিক্ষকের পদ ২০১টি। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক কোর্সসহ ১৮টি বিষয়ে অনার্স ও মাষ্টার্স কোর্স চালু আছে। ছাত্রদের জন্য ৩টি ছাত্রাবাস এবং ছাত্রীদের জন্য ২টি ছাত্রীনিবাস রয়েছে। প্রায় অর্ধলক্ষ পুস্তকসমৃদ্ধ একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি রয়েছে। তাছাড়া প্রতি বিভাগে রয়েছে বিষয়ভিত্তিক পুস্তকসমৃদ্ধ সেমিনার-লাইব্রেরি। কলেজে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট কার্যক্রম চালু রয়েছে। একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধূলা, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রভৃতি শিক্ষা সহায়ক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।
একাডেমিক তথ্যাবলী ঃ আনন্দ মোহন কলেজে প্রতি কর্মদিবসে সকাল ৯ টা হতে ক্লাস শুরু হয় এবং বিকাল ৪টা পযর্ন্ত চলে।
টিউটোরিয়াল পরীক্ষা ঃ প্রতিশিক্ষাবর্ষে কম করে হলেই দু’টি টিউটোরিয়াল পরীক্ষা গ্রহন করা হয় এবং টিউটোরিয়াল ক্লাস ও ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে টিউটোরিয়াল বিষয়ে নম্বর প্রদান করা হয়।
বিভাগীয় মিড টার্ম ও র্টাম ফাইনাল পরীক্ষা ঃ প্রতি শিক্ষাবর্ষে মেজর ও নন-মেজর কোর্সের উপর বিভাগীয় মিড টার্ম ও র্টাম ফাইনাল পরিক্ষা গ্রহন করা হয়। এই সব পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রীদের মেধাক্রম নির্ধারণ করে বিভাগের পক্ষ থেকে তিনজনকে পুরস্কৃত করা হয়।
কেন্দ্রীয় মডেল টেস্ট ঃ কলেজে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতি শিক্ষাবর্ষে মেজর ও নন-মেজর কোর্সের উপর কেন্দ্রীয় মডেল টেস্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় সকল কোর্সে উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হতে ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতি বিভাগ হতেই তিনজনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
উপস্থিতি ঃ প্রতিটি বিভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে। প্রতি তিন মাস অন্তর ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি মূল্যায়ন করে ৬০% এর নীচে হলে তাকে সতর্ক করে দেয়া এবং প্রয়োজন অনুসারে অভিভাবকদেরকেই পত্র দ্বারা বিষয়টি অভিহিত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, কোন ছাত্র-ছাত্রীর ৭৫% ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয় না।
দেয়ালিকা প্রকাশ ও শিক্ষা সহায়ক অন্যান্য কার্যক্রম ঃ প্রতিটি বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিতভাবে জাতীয় কর্মসূচী ও বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক নানাবিধ কর্মসূচি আলোচনা করে। যেখানে তারা নিজস্ব যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পায়।
আচারণ ঃ প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে ছাত্রসূলভ আচারণ শিক্ষা দেয়া হয়। যার মাধ্যমে পরবর্তীতে তারা একজন মূল্যাবোধ সম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠার সুযোগ পায়।
সেমিনার ঃ প্রতিটি বিভাগে সমৃদ্ধ সেমিনার রয়েছে। যেখান থেকে প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বই ইস্যু করা হয় এবং বিভাগীয় শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা বিষয়ক নানাবিধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
পত্রিকা ঃ প্রতিটি বিভাগে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকা সংগ্রহ করা হয়।
শতবর্ষের ঐতিহ্যে লালিত আনন্দ মোহন কলেজ বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কলেজগুলোর অন্যতম। এ কলেজের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ও গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আনন্দ মোহল কলেজ ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর কার্যক্রম শুর" হয় ১৯০৯ সালে। এই মহান উদ্য্যোগের সঙ্গে যাঁর নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হচ্ছেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, সমাজসংস্কারক ব্যারিস্টার আনন্দমোহন বসু ১৮৮৩ সালে ১ জানুয়ারি ময়মনসিংহ শহরের রাম বাবু রোডে তাঁর পৈত্রিক বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করে "ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন”। আনন্দমোহন বসু ১৮৮২ সালে ভারত সরকার কর্তৃক গঠিত প্রথম শিক্ষা কমিশনের অন্যতম প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। তাছাড়া তিনি কলকাতার সিটি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। কলকাতার বেশকিছু গণ্যমান্য শিক্ষাবিদ নিয়ে গঠিত একটি কাউন্সিল সিটি কলেজ পরিচালনা করতেন, আনন্দমোহন বসু ছিলেন সেই কাউন্সিলের সভাপতি। ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাস থেকে ময়মনসিংহ ইনস্টিটিউশন "ময়মনসিংহ সিটি কলেজিয়েট স্কুল” নামে অভিহিত হয়। ১৮৯৯ সালে আনন্দমোহন বসু কলকাতা থেকে ময়মনসিংহ এলে ময়মনসিংহের স্থানীয় উৎসাহী অধিবাসীগণ ছাড়াও "ময়মনসিংহ সভা” এবং "আঞ্জুমানে ইসলামিয়া” এর যৌথ আবেদনে ময়মনসিংহে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবী জানানো হয়। এ দাবীর পরিপ্রেক্ষীতে কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের সভাপতি আনন্দমোহন বসু ১৯০১ সনের ১৮ জুলাই সিটি কলেজিয়েট স্কুলকে ‘ময়মনসিংহ সিটি কলেজ’ নামে দ্বিতীয় শ্রেণীর কলেজে রূপান্তর করে এবং একে কলকাতার সিটি কলেজের সাথে যুক্ত করেন। প্রাথমিক অবস্থায় কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিলের আর্থিক সহযোগিতায় ময়মনসিংহ সিটি কলেজ পরিচালিত হতো, পরের বছর ১৯০২ সালের এপ্রিল মাসে এটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ইতোমধ্যে স্থানীয় অধিবাসীদের অর্থ সাহায্যে কলেজের পুরোবাগে রাস্তার পাশে কলেজের জন্য পাকা ভবন নির্মিত হয়।১৯০৬ সালে আনন্দমোহন বসুর মৃত্যুর পর ময়মনসিংহ সিটি কলেজ নানা সংকটের সম্মুখীন হয়। প্রথমত কলকাতা সিটি কলেজ কাউন্সিল অর্থনৈতিক সমস্যার কারণে ময়মনসিংহ সিটি কলেজকে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বিযুক্তকরণের জন্য কলাকতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট দাবী পেশ করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৮ সালের ৩১ মার্চ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কলকাতা সিটি কলেজ থেকে ময়মসসিংহ সিটি কলেজের সংযুক্তি সম্পূর্ণর"পে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। এই অবস্থায় কলেজের কার্যক্রম একপ্রকার বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তখন প্রিন্সিপাল বৈকুন্ঠনাথ চক্রবর্তী কলেজটির পুনর্গঠনের উদ্যোগে নেন এবং তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. জে. আর. ব্ল্যাকউডের শরণাপন্ন হন। মিদ জে. আর. বল্যাকউড স্থানীয় শিক্ষাবিদ ও উদ্যমী ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন কমিটি গঠন করে
" ময়মনসিংহ কলেজ ” নামে কলেজটিকে পুনুজ্জবীত করেন। এ কমিটি কলেজের পরিচালনা ও যাবতীয় খরচের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং কলেজের জন্য তহবিল ও নতুন জায়গা সংগ্রহের জোরালো প্রচেষ্টা গ্রহন করে। তৎকালীন ভাবরত সরকারের গ্রান্ট-ইন-এইড- এর আওতায় অর্থ সাহায্য প্রদােেনর জন্য বিভাগীয় কমিশনার এর সাথে কমিটি সাক্ষাৎ করে। বিভাগীয় কমিশানার কলেজের নতুন ভবন নির্মাণের জন্য ৫৫,০০০/-(পঞ্চান্ন হাজার) টাকা বরাদ্দ দেন। পাশাপাশি কলেজের সার্বিক উন্নতির জন্য স্থানীয় কয়েকজন জমিদার ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিগতভাবে ১,১৮,৩৯৫/- (এক লক্ষ আঠার হাজার তিনশত পঁচানব্বই) টাকা এককালীন অনুদান প্রদান করেন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কয়েকজনের নাম ও অনুদানের পরিমাণ নিন্মর"প:
১. মহারাজা শশীকান্ত আচার্য্য চৌধুরী (মুক্তাগাছা) ৪৫,০০০/- টাকা
২. রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ( রামগোপালপুর ) ৩০,০০০/- টাকা
৩. রাণী দিনমনি চৌধুরাণী ( সন্তোষ) ২০,০০০/- টাকা
৪. বাবু হেমচন্দ্র চৌধুরী (আম্বারিয়া) ১০,০০০/- টাকা
৫. রাজা জগতকিশোর রায় চৌধুরী (গৌরীপুর) ৫,৫০০/- টাকা
৬. বাবু প্রমথনাথ রায় চৌধুরী ( সন্তেষ) ৫,০০০/- টাকা
৭. রাণী হেমন্ত কুমারী দেবী (পুটিয়া) ১,০০০/- টাকা
৮. শ্রীমতি বামা সুন্দরী দেবী (ভবানীপুর) ১,০০০/- টাকা
ময়মনসিংহ জেলার প্রথম মুসলিম গ্র্যাজুয়েট, আনন্দমোহন বসুর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজের সহপাঠী বন্ধু, আঞ্জুমানে ইসলামিয়া - এর সভাপতি ও বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী মৌলভী হামিদ উদ্দিন আহমদ কলেজের জন্য কাঁচিঝুলীতে ২৬ বিঘা জমি দান করেন এবং তার বন্ধু আনন্দমোহন বসুর নামে কলেজটির নামকরণের প্রস্তাব করেন। মৌলভী হামিদ উদ্দিন ছাড়াও তার জমির পাশ্ববর্তী আরো কয়েক বিঘা জায়গা স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ কলেজের জন্য দান করেন। সরকারি-বেসরকারি নানা উৎস থেকে সংগৃহীত অর্থ এবং জমি পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কলেজটি কাঁচিঝুলীর বর্তমান স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়। নতুন ভব নির্মানসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করে ১৯০৮ সালের শেষের দিকে "ময়মনসিংহ কলেজ” এর নাম পরিবর্তন করে মৌলভী হামিদ উদ্দিন এর
প্রস্তাবমতো কলেজের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা আনন্দমোহন বসুর নামানুসারে " আনন্দ মোহন কলেজ ” রাখা হয় এবং শিক্ষা কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। কয়েক বছরের মধ্যেই এটি একটি প্রথম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত হয়। ফলে ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এটিকে প্রথম গ্রেডের কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। কলেজের সার্বিক উন্নয়নে ময়মনসিংহ পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান রায় বাহাদুর শ্যামাচরণ রায় এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
১৯১৪ সালে কলেজটি প্রথম গ্রেডে উন্নীত হওয়ার পর থেকে কলেজরি খ্যাতি এবং ছাত্রসংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং কালকমে এটি এতদঞ্চললের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে । ১৯৬৪ সালের অক্টোবরে কলেজকিে সরকারিকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘ বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার পর কলেজের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ একাডেমিক কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়। শিক্ষকের পদ সংখ্যা বৃদ্ধি, নতুন নতুন বিভাগ প্রতিষ্ঠা, ছাত্রাবাস, ছাত্রীনিবাস ও একাডেমিক ভবন নির্মিত হয়। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠাকালে যেখানে আনন্দ মোহন কলেজে ছাত্র ছিল ১৭৮ জন এবং শিক্ষক ছিলেন ৯জন, সেখানে বর্তমানে ছাত্র সংখ্যা প্রায় ২৫,০০০ এবং শিক্ষকের পদ ২০১টি। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক কোর্সসহ ১৮টি বিষয়ে অনার্স ও মাষ্টার্স কোর্স চালু আছে। ছাত্রদের জন্য ৩টি ছাত্রাবাস এবং ছাত্রীদের জন্য ২টি ছাত্রীনিবাস রয়েছে। প্রায় অর্ধলক্ষ পুস্তকসমৃদ্ধ একটি কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি রয়েছে। তাছাড়া প্রতি বিভাগে রয়েছে বিষয়ভিত্তিক পুস্তকসমৃদ্ধ সেমিনার-লাইব্রেরি। কলেজে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট কার্যক্রম চালু রয়েছে। একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি খেলাধূলা, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা প্রভৃতি শিক্ষা সহায়ক কর্মকান্ডের ব্যবস্থা রয়েছে।
শিক্ষার উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত পদক্ষেপসমূহ
একাডেমিক তথ্যাবলী ঃ আনন্দ মোহন কলেজে প্রতি কর্মদিবসে সকাল ৯ টা হতে ক্লাস শুরু হয় এবং বিকাল ৪টা পযর্ন্ত চলে।
টিউটোরিয়াল পরীক্ষা ঃ প্রতিশিক্ষাবর্ষে কম করে হলেই দু’টি টিউটোরিয়াল পরীক্ষা গ্রহন করা হয় এবং টিউটোরিয়াল ক্লাস ও ফলাফলের উপর ভিত্তি করে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে টিউটোরিয়াল বিষয়ে নম্বর প্রদান করা হয়।
বিভাগীয় মিড টার্ম ও র্টাম ফাইনাল পরীক্ষা ঃ প্রতি শিক্ষাবর্ষে মেজর ও নন-মেজর কোর্সের উপর বিভাগীয় মিড টার্ম ও র্টাম ফাইনাল পরিক্ষা গ্রহন করা হয়। এই সব পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রীদের মেধাক্রম নির্ধারণ করে বিভাগের পক্ষ থেকে তিনজনকে পুরস্কৃত করা হয়।
কেন্দ্রীয় মডেল টেস্ট ঃ কলেজে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতি শিক্ষাবর্ষে মেজর ও নন-মেজর কোর্সের উপর কেন্দ্রীয় মডেল টেস্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষায় সকল কোর্সে উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হতে ফলাফলের ভিত্তিতে প্রতি বিভাগ হতেই তিনজনকে কেন্দ্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করা হয়।
উপস্থিতি ঃ প্রতিটি বিভাগ ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করে। প্রতি তিন মাস অন্তর ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিতি মূল্যায়ন করে ৬০% এর নীচে হলে তাকে সতর্ক করে দেয়া এবং প্রয়োজন অনুসারে অভিভাবকদেরকেই পত্র দ্বারা বিষয়টি অভিহিত করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, কোন ছাত্র-ছাত্রীর ৭৫% ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয় না।
দেয়ালিকা প্রকাশ ও শিক্ষা সহায়ক অন্যান্য কার্যক্রম ঃ প্রতিটি বিভাগের ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিতভাবে জাতীয় কর্মসূচী ও বাংলা সংস্কৃতি বিষয়ক নানাবিধ কর্মসূচি আলোচনা করে। যেখানে তারা নিজস্ব যোগ্যতা ও দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পায়।
আচারণ ঃ প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীকে ছাত্রসূলভ আচারণ শিক্ষা দেয়া হয়। যার মাধ্যমে পরবর্তীতে তারা একজন মূল্যাবোধ সম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠার সুযোগ পায়।
সেমিনার ঃ প্রতিটি বিভাগে সমৃদ্ধ সেমিনার রয়েছে। যেখান থেকে প্রতিদিন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বই ইস্যু করা হয় এবং বিভাগীয় শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষা বিষয়ক নানাবিধ প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়।
পত্রিকা ঃ প্রতিটি বিভাগে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকা সংগ্রহ করা হয়।
ইনশাল্লাহ শীঘ্রই কলেজের উপর বিস্তারিত লেখা আসবে।
তথ্যসূত্র: আনন্দ মোহন কলেজ ওয়েব সাইট
Subscribe to:
Posts (Atom)